আমার মেঘালয় ভ্রমণ

শেষ পর্ব

শিলং থেকে সোনাংপেডেং হয়ে বাংলাদেশ।

(ক্রাংসুরি ফলস, সোনাংপেডেং, সাসপেনশন ব্রিজ, উমগট নদী, কায়াকিং)

==================================

পরদিন সকালে ভোরে ঘুম থেকে উঠলাম। সমরজিত গাড়ি নিয়ে হাজির। আজ আমরা যাবো সোনাংপেডেং। পথে ক্রাংসুরি ফলস দেখবো।
হোটেল জারা রেসিডেন্সি চেক আউট করে, বাক্সপেটরা নিয়ে গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। সমরজিতকে বললাম, যেতে যেতে রাস্তায় কোথাও আমাদের ব্রেকফাস্ট করিয়ে নিতে। সমরজিত ছুটে চললো। প্রায় নয়টা নাগাদ আমরা রাস্তার পাশের একটি খাসিয়া ধাবা থেকে সকালের নাস্তা সারলাম। তারপর আবার ছুটে চলা। রাস্তা ছিল সুন্দর। দুইপাশের ভিউ ছিল অসাধারণ। আমরা যখন ক্রাংসুরি ফলসে পৌঁছলাম তখন প্রায় দুইটা বাজে। গাড়ি পার্কিং করে অনেকটা পথ নিচে নামতে হলো। তারপর ক্রাংসুরি ঝর্ণাটি দেখে আমরা কেবল মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়েই রইলাম। সত্যি বলতে কি আমাদের মেঘালয় ট্রিপের যতগুলি ঝর্ণা তখন পর্যন্ত দেখেছি,তার মধ্যে এই ক্রাংসুরি ছিল সেরা। সেটা সব দিক দিয়েই। যেমন আয়তনে বিশাল ছিল, তেমনি সৌন্দর্যে অতুলনীয় ছিল। অনেক্ষণ আমরা সেই ঝর্ণার পাদদেশে বসে রইলাম পাথরের উপর। ছবি তুললাম সবাই। ঝর্ণার উপরের দিকে একটি বাঁধের মত করে পানি ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সেই পানিই গিয়ে ঝর্না হয়ে পড়ছে। সেই বাঁধটিও ছিল ভীষণ সুন্দর।

40480818_10209578667142568_3950143364149542912_n
ক্রাংসুরি ফলসের কাছাকাছি।
40472420_10209578563899987_2368991831762403328_n
অপরূপ ক্রাংসুরি ফলস

ক্রাংসুরি শেষ করে আবার ছুটে চললাম। এবার গন্তব্য সোনাংপেডেং। যাবার পথে অদ্ভুতভাবে মেঘে ঢেকে গেল চারপাশটা। মনে হচ্ছিল ঘন কুয়াশা। সমরজিত হেডলাইট জ্বালিয়ে ধীরে ধীরে দক্ষ হাতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল।
আমরা যখন সোনাংপেডেং পৌঁছলাম, তখন প্রায় সন্ধ্যা। পৌঁছেই হালাটং হোমস্টে তে উঠলাম। যার মালিক ছিল মানবাহা। আগে থেকে ঠিক করিনি, কিন্তু খালি ছিল। রাস্তার পাশেই ছিমছাম বাঁশ আর কাঠের তৈরী কটেজ। একরুমে চারজন করে থাকা যায়। তবে আমরা দুইটা রুম নিলাম। ভাড়া ছিল প্রতিরাত ১ হাজার করে দুই রুম দুই হাজার। সস্তাই মনে হলো। মানবাাহা ভাইর আন্তরিকতা ভালো ছিল। হোমস্টেতে উঠে ফ্রেস হয়ে আমরা একটু ঘুরতে বের হলাম। প্রথমেই গেলাম সোনাংপেডেঙের সাসপেনশন ব্রিজ দেখতে। চারপাশে উঁচু পাহাড়। এপার থেকে ওপার অর্থাৎ এ পাহাড় থেকে ওপাহাড়ের সাথে একটি বন্ধন তৈরী করেছে এই ঝুলন্ত ব্রিজঠি। লম্বায় বেশ বড়। নীচে বয়ে যাচ্ছে কাচের মত স্বচ্ছ পানি। বেশ কিছুটা সময় এই ব্রিজে কাটিয়ে রাত নেমে এলে আমরা ব্রিজ থেকে নেমে পড়লাম। তারপর পাশেই একটি টং দোকান থেকে হালকা চা নাস্তা করে আমরা একটু সোনাং পেডেং গ্রামের ভিতর হাঁটলাম। বেশ ভালো লাগলো। হাঁটাহাটি শেষ করে কটেজের কাছে আসতেই মানবাহা জানিয়ে দিল, আটটার মধ্যে রাতের খাবার না খেলে খাবার পাওয়া বেশ মুশকিল হবে।
আমরা আসার সময় একটি সুন্দর রেস্টুরেন্ট দেখে এসেছিলাম। যেটি মানবাহা ভাইয়ের কটেজ থেকে মিনিট পাচেক লাগবে হেটে যেতে। সেখানেই রাতের খাবার খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। সাড়ে আটটার দিকে সবাই মিলে অন্ধকারে মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে হেটে চলে গেলাম ওই রেস্টুরেন্টে। নাম ছিল- বেটেলনাট রেস্টুরেন্ট। অসাধারণ সুন্দর ছিল সেই রেস্টুরেন্টটি। আমরা চিন্তাই করতে পারিনি, এই রকম একটি নিভৃত পাহাড়ী পল্লীতে এত সুন্দর আধুনিক সব সেটিংস ফিটিংসে একটি রেস্টুরেন্ট থাকতে পারে। শুধু যে রেস্টুরেন্টটি সুন্দর ছিল তাই নয়, এর খাবারও ছিল গুনে মানে অনন্য। পেট পুরে সবাই খেয়ে কটেজে ফিরলাম আমরা। তারপর কটেজের বেলকনির মত জায়গায় সবাই বসে রাত প্রায় বারোটা পর্যন্ত গান বাজনা করলাম। সেই রাত ছিল অসাধারণ। আমাদের মেঘালয় ভ্রমণের সেরা রাত।
পরদিন সকালে উঠলাম। নাস্তা করলাম একটি অখ্যাত রেস্টুরেন্টে। খাবারের তালিকায় ছিল, পরোটা আর ডিম ভাজি। মোটামুটি ছিল সেই খাবার। চা খেয়ে বের হলাম বোটিং করতে। সাসপেনশন ব্রিজের নীচ দিয়ে স্বচ্ছ পানির যে নদীটি বয়ে গেছে সেটির নাম উমগট নদী। সেই নদীতেই বোটিং করার সিদ্ধান্ত নিলাম। কোষা টাইপের নৌকাগুলোতে একটিতে ছয়জন পাচজন করে বসতে পারবে। আমরা দুইট নৌকা নিয়ে তিনজন করে ভাগ হয়ে বসলাম। প্রতি নৌকা এক ঘন্টার জন্য মিটালাম চারশো রুপি করে। বাধ্যতামূলকভাবে লাইফ জ্যাকেট পড়তে হবে। তবে এর জন্য কোনো চার্জ নেই। উমগট নদীতে একঘন্টা বোটিং টাইমটা ছিল অসাধারণ। বোটিং করতে করতে আমরা নদীর দুইপাড়ের পাহাড়ীদের মাছ শিকার করা দেখলাম। পাশেই দুইটি ছোট ছোট ঝর্ণা ছিল। যেগুলোর পানি নদীতে এসে মিশেছে। পানি ছিল অনেক স্বচ্ছ। তবে এই পানি শীতের সময় আরো কাচের মত স্বচ্ছ হয়ে যায়।
বোটিং শেষ করে আমরা উমগট নদীতে গোসল করলাম। পানি ছিল ভীষণ ঠান্ডা। গোসল করার পর খুব ফ্রেস মনে হচ্ছিল। তবে গোসল শেষে কটেজে ফিরে আবারও গোল করলমা। তারপর রেডি হলাম কটেজ ছেড়ে দেয়ার জন্য। কারণ আমাদের টার্গেট ছিল চারটার মধ্যে ডাউকি বর্ডার পার হওয়া। দুইটার দিকে আমরা দুইটি ছোট গাড়ি ভাড়া করলাম বর্ডার পর্যন্ত যাওয়ার জন্য। আগের দিন সন্ধ্যায় সোনাংপেডেং পৌছেই আমরা সমরজিতে হিসাব চুকিয়ে দিয়ে তাকে বিধায় দিয়েছিলাম। তবে তার আন্তরিকতা আমাদের মনে থাকবে।

40427405_10209578686783059_4230624485427904512_n
সোনাংপেডেং এর উমগট নদী
40475494_10209578438856861_7330198431857639424_n
উমগট নদীতে আমাদের বোটিং
40497504_10209578266492552_4576467436924043264_n
উমগট নদীতে গোসল
40442068_10209578517218820_7204142773807611904_n
সাসপেনশন ব্রিজ
40548510_10209578578740358_1089948049867800576_n
সাসপেনশন ব্রিজ
40481235_10209578443376974_7000709161046507520_n
মন খারাপ করা সোনাংপেডেং

ছোট দুইটি সেন্ট্রো টাইপের গাড়ি নিয়ে আমরা তিনজন করে ভাগ হয়ে বর্ডারের দিকে রওনা দিলাম। যাবার পথে সেই বেটেলনাট রেস্টেুরেন্টে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। তারপর ডাউকি বাজারে গিয়ে সবাই চকলেট কিনে নিলাম। দামের পার্থক্য শিলং থেকে খুব একটা বেশি নয়।
আমরা চারটার মধ্যেই বর্ডার পার হয়ে গেলাম। তারপর তামাবিল গিয়ে কোনো লেগুনা না পাওয়ায় আমাদের প্রাইভেট কার ভাড়া করতে হলো। এইখানে আমরা একটু ধরা খেলাম। দুইটি প্রাইভেট কার নিলাম ৩৬০০ টাকা দিয়ে। কারণ তখন কোনো লেগুনাই পাচ্ছিলাম না। কি আর করা। তবে দ্রুত সিলেট গিয়ে পৌছলাম। আমাদের ঢাকার উদ্দেশ্যে বাস ছিল সন্ধ্যা সাতটায়। গিয়ে ভালোভাবেই বাস ধরলাম। ইউনিকের সেই বাসে উঠেই ঘুম। যখন ঢাকা পৌছলাম, তখন রাত একটা। নেমেই যার যার গন্তব্যস্থলে চলে গেলাম। সেবারের মত খুব সুন্দরভাবে আমাদের মেঘালয় ভ্রমণের ইতি টানলাম।

সমাপ্ত।

আমার মেঘালয় ভ্রমণ

পর্ব-০৩

শিলং সিটি ট্যুর

(গলফ ক্লাব মাঠ, উমিয়াম লেক, ডন বসকো মিউজিয়াম, লেডি হায়দারী পার্ক)

পরের দিন শিলংয়ে আমরা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠলাম। সমরজিতও তার গাড়ি নিয়ে রেডি। আজ আমরা শিলং সিটি ট্যুর দেব। ফ্রেস হয়ে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। সমরজিত প্রথমেই শহর থেকে একটু দূরে আমাদের সকালের নাস্তা করতে নিয়ে গেল। শিলংয়ের কিছু বিখ্যাত মিস্টি আইটেম দিয়ে আমরা লুচি খেলাম। খুব মজার ছিল সেই নাস্তা। তারপর আমরা প্রথমেই গেলাম গলফ ক্লাব মাঠে। এখানে কোনো টিকিটের ব্যাপার ছিলনা। জায়গাটি দেখার মতই। চারদিকে সমান্তরাল মাঠ উচুনিচু সবুজে ঘেরা। যতদূর চোখ জায় কচি সবুজ ঘাস। যেন ঘাসের কার্পেট বিছিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে আমরা অনেক্ষণ কাটালাম। ভাগ্য ভালো ছিল তাই গলফ খেলাও দেখতে পেরেছিলাম।

40424742_10209578391655681_157942650601734144_n
সবুজ গলফ ক্লাব মাঠ
40441122_10209578291933188_7219535215041970176_n
বিস্তৃত সবুজের গালিচা
40457771_10209578456537303_8081619410017583104_n
একটি ছবির জন্য পোজ
40406680_10209578659382374_1400311114050306048_n
বড় ভাই গলফ খেলছেন।

এরপর চলে গেলাম উমিয়াম লেক। টিকিট ছিল ৪০ রুপি প্রতিজন। তবে গিয়ে মন ভালো হয়ে যাবে। শিলং শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। লেকটি বেশি বড় নয়। তবে অসাধারণ তার ভিউ পয়েন্ট। লেকের চারপাশে সবুজ পাহাড়গুলো মাথায় মেঘ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই পাহাড়রের পাদদেশেই শান্ত নীল পানির এই লেক। অসম্ভব রকম শান্ত পানিতে পাহাড়ের ছাড়া পড়ে যেন মায়াময় এক রূপ ধারণ করে আছে। আপনি চাইলে এই শান্ত পানিতে বোটিং করতে পারবেন। তবে সেটা আমাদের কাছে অনেক বেশি ব্যায় বহুল মনে হওয়ায় আমরা করিনি। ৬ জন ১০ মিনিটের জন্য বোটিং রেট ছিল ১২ শো রুপি। কোনো মানে খুঁজে পাইন। তবে লেকের পাশে দাঁড়িয়ে মন ভরে এর সৌন্দর্য উপভোগ করেছি।

40455533_10209578639981889_3488553986078801920_n
উয়িমাম লেক
40424748_10209578520378899_6851762740353040384_n
মায়াময় উমিয়াম লেক
40455435_10209578653782234_7899867762829295616_n
সামনে অপার বিষ্ময়
40461444_10209578611941188_1321011539431391232_n
পাহাড়ের পাদদেশে শান্ত লেক।

লেক থেকে বের হয়ে আমরা চলে গেলাম ডন বসকো মিউজিয়াম। গিয়ে শুনি জনপ্রতি টিকিট মূল্য ২ শো রুপি করে। প্রথমে ভাবলাম, এতটাকা দিয়ে জাদুঘর দেখার কোনো মানে হয়না। বিশেষ করে ঢাকায় আমাদের জাতীয় জাদুঘর অনেকবার দেখে দেখে জাদুঘরের প্রতি তেমন আকর্ষণবোধ ছিলনা আমাদের। তাই চলেই আসবো, ঠিক তখনই সমরজিত বললো, দাদা ভুল করবেন। এখানে একবার হলেও যান। সমরজিতে কথা ফেলতে পারলাম না। এসেছি যখন দেখেই যাই। ঢুকলাম ছয়জন বারোশো রুপি দিয়ে। ক্যামেরার জন্য এক্সট্রা ১০০ রুপি দিলাম। ঢুকেই চোখ চড়ক গাছ। একটি মিউজিয়াম যে এতটা বিষ্ময়কর এবং সুন্দর হতে পারে না ঢুকলে বুঝতাম না। পুরো মিউজিয়ামটি ছিল সাত তলা। প্রায় দুই ঘন্টা সময় নিয়ে দেখলাম। পুরো নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়ার আটটি স্টেট নিয়ে এই মিউজিয়ামটি তৈরী করা হয়েছে। এই নর্থ ইস্টের মানুষগুলোর জীবন ধারা, সংস্কৃতি, আচার অনুষ্ঠান এতটা নিখুতভাবে এখানে তুলে ধরা হয়েছে যে না দেখলে তা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। সব থেকে বিষ্ময় ছিল এই মিউজিয়ামটির ছাদ। যেখান থেকে পুরো শিলং শহরের একটি কালারফুল ভিউ পাওয়া যায়। আর শেষে ছিল নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়ার উপর নির্মিত নয় মিনিটের একটি প্রামাণ্য চিত্র। সব দেখে আমাদের একটাই ফিল হয়েছি, কেউ যদি শিলং সিটি ট্যুর থেকে এই ডন বসকো মিউজিয়ামটি বাদ দেয়, তবে সে শিলংয়ের কিছুই দেখলো না।

40460076_10209578574740258_4970640517235736576_n
ডন বসকো মিউজিয়াম
40443729_10209578517658831_5289416408738824192_n
মিউজিয়ামের সামনের একটি স্ট্যাচু
40545201_10209578542939463_7444049223076544512_n
মিউজিয়ামের করিডোর
40457460_10209578636621805_8239146020022255616_n
ভিউজিয়ামের ভিতরে
40424779_10209578374055241_8206367993555320832_n
মিউজিয়ামের ছাদ থেকে শিলং শহর
40432711_10209578633741733_5775594521823805440_n
কালারফুল শিলং শহর
40467203_10209578426936563_5375000345145507840_n
ছাদের ভিউ ।
40498873_10209578629461626_5820954130998362112_n
ছাদ থেকে শিলং শহর।

মিউজিয়াম থেকে নেমে এসে আবারও সমরজিতকে বড় করে সবাই ধন্যবাদ দিলাম। সমরজিত খুশি হয়ে আমাদের নিয়ে গেল লেডী হায়দারী পার্কে। তবে এখানে তেমন ভালো লাগেনি। একটি ছোট পার্ক। অনেকেই বাচ্চাকাচ্চা আর পরিবার নিয়ে এসে সময় কাটাচ্ছে। পাশেই একটি চিড়িয়াখানার মত রয়েছে। কিন্তু কোনো জীবজন্তুর দেখা নেই। ওখানে আমরা মিনিট বিশেক কাটিয়ে চলে এলাম। ততক্ষণে তিনটা বেজে গেছে। দুপুরের খাবার খেলাম রাস্তার পাশে মম। এরপর আমরা শিলং শহরে অর্থাৎ পুলিশ বাজারে চলে এলাম। পরদিন ভোরে আমরা শহর ছেড়ে চলে যাবো। সুতরাং অনেকেই আবদার করলো বাকি সময়টা শপিংয়ের জন্য সবাইকে যার যার মত ছেড়ে দেয়া হোক। সুতরাং সমরজিতকে বিধায় দিয়ে আমরা শপিংয়ে বের হয়ে পড়লাম।
শপিং শেষ করে সবাই হোটেলে ফিরলাম রাত সাড়ে আটটা নাগাদ। এরপর আবার বের হয়ে রাতের খাবার শেষে একটু শহরের ভিতর হাঁটাহাটি করে আবার রুমে ফিরে ঘুমিয়ে পড়লাম।

(ধারাবিহক চলবে)

আমার মেঘালয় ভ্রমণ

পর্ব-০২

চেরাপুঞ্জি থেকে শিলং

(সেভেন সিস্টার্স ঝর্ণা, মাউসমাই কেভ, ইকোপার্ক, নোহকালিকাই ফলস, গ্রীণ ভ্যালী ভিউ পয়েন্ট, ওয়াকা ফলস, এ্যালিফেন্ট ফলস)

=================================

সমরজিত তার গাড়িতে আমাদের নিয়ে ছুটে যাচ্ছিল। আমরা ক্রমশই ঢুকে যাচ্ছিলাম অপরূপ প্রকৃতির সেই বাস্তব ক্যালেন্ডারের ছবির ভিতরে। আমাদের ভাগ্য খুবই সুপ্রসন্ন ছিল যে, তখন আবহাওয়া ছিল সম্পূর্ণ ট্যুর বান্ধব। আকাশে মেঘ ছিল, কিন্তু সেগুলো খন্ড খন্ড আকারে তুলার মত সবুজ পাহাড়ের গায়ে গায়ে ভাসছিল। চারদিকটায় সোনালী এক আলোতে ভরে গিয়েছিল। সবুজকে মনে হচ্ছিল চোখ ধাঁধানো। তবে গতরাতের জার্নির ক্লান্তি এবং দুপুরে পেট পুরে খাওয়ার অলসতা আমাদের চোখে ভর করেছিল। কিন্তু করলে কি হবে? চোখ দুটো কোনোমতেই বন্ধ করা যাচ্ছিল না। একটার পর একটা পাহাড় তাদের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য নিয়ে ম্যাজিকের মত করে আমাদের চোখের সামনে এসে হাজির হচ্ছিল। চোখ বন্ধ তো ম্যাজিক মিস। জীবনে তো কতই ঘুমিয়েছি, এবার না হয় নাইবা ঘুমালাম-এটাই ছিল তখন আমাদের চোখের জন্য সান্তনা।
দেখতে দেখতে অনেকটা পথ পার হয়ে এসে আমরা থামলাম একটি ভিউ পয়েন্টে। সেটির নাম আমি ইংরেজিতে লিখছি। Cannyon Rngain View Point. নামটি ইংরেজীতে একারণে লিখলাম যে, বাংলায় এটির উচ্চারণ আমার মুখে আসছিল না। এখানে আমরা দশ রুপি করে টিকিট কেটে ঢুকলাম। এটি মূলত একটি ভিউ পয়েন্ট যেখান থেকে মেঘালয়ের অর্থাৎ চেরাপুঞ্জির পাহাড়গুলোর একটি বিস্তৃত ল্যান্ডস্কেপ ভিউ পাওয়া যায়। নীচে তাকালে দেখা যাবে একটি সাজানো গোছানো গ্রাম। তবে সেগুলো দেখতে অনেকটা খেলনা ঘরবাড়ির মত। পাশেই পাহাড়ের গায়ে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে চিকন সাপের মত আঁকাবাঁকা রাস্তা চলে গেছে দূরে কোথাও। যখন মনে হবে ওই রাস্তা ধরেই আমরা চেরাপুঞ্জি যাবো, তখন শরীরে একটি শিহরণ খেলে যাবে। এই ভিউ পয়েন্টে আমরা আধ ঘন্টার মত ছিলাম। পাশেই খাবারের রেস্টুরেন্ট আছে। চাইলে আপনারা এখান থেকে কিছু স্ন্যাক্স জাতীয় খাবার খেতে পারেন। আমরা এক ডজন কলা কিনলাম। প্রতি পিছ কলার দাম পড়লো ১০ রুপি করে। কিন্তু সেটার স্বাদ ছিল অতুলনীয়। আমি এখনও ভুলিনি সেই স্বাদ।

40435702_10209578450497152_439289349524160512_o
Cannyon Rngain Vally View Point
40570055_10209578375215270_1707561404980002816_o (1)
দূরের রাস্তায় আমরা এসেছি।
40526711_10209578605821035_2393109395979370496_o (1)
বুক ভরে শ্বাস নিচ্ছিলাম।

আমরা যখন চেরাপুঞ্জি গিয়ে পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যা। আমরা আগে থেকে কোনো হোটেল বুকিং করে যাইনি। তবে সেভেন সিস্টার্স ঝর্ণার একদম সামনে, অর্থাৎ ওই হোটেল থেকে সরাসরি সেভেন সিস্টার্স ঝর্ণা দেখা যায়, হোটেলের নাম- হোটেল সেভেন সিস্টার্স ভিউ ইন। এই হোটেলটির প্রতি আমার একটা দূর্বলতা ছিল। মনে মনে একটি আশা ছিল চেরাপুঞ্জি গেলে এই হোটেলে একরাত থাকবো। সুতরাং আমি ঢাকা থেকেই অনলাইনে চেষ্টা করেছিলাম এই হোটেলে রুম বুকিং দিতে। কিন্তু আমি যে তারিখ চেরাপুঞ্জি পৌঁছবো, সেই তারিখের কোনো রুমই ছিলনা তাদের। সুতরাং আগেই হতাশ ছিলাম। তারপরও চেরাপুঞ্জি স্ব-শরীরে এসে কেন যেন মনে হলো, দেখি না একবার ট্রাই করে। গাড়ি থামালাম ওই হোটেলের সামনে। সোজা রিসিপশনে চলে গেলাম। রুমের জন্য রিকোয়েস্ট করতেই রুম মিলে গেল। নীচ তলায় ফ্ল্যাটের মত দুইরুমের একটি সেটিংস। তিনটা বেডে অনায়াসে ছয়জন থাকা যাবে। আর কী আনন্দ! আমরাও ছয়জন ছিলাম। উনারা চাইলো ৬ হাজার রুপি প্রতি রাত। সেটা দামাদামি করে আমরা যখন ৫ হাজারে নামিয়ে নিয়ে আসলাম, তখন আমাদের আনন্দ আর দেখে কে! ক্লান্ত শরীরে ব্যাগপত্র গাড়ি থেকে নামিয়ে, হোটেলে চেক ইন করে, ফ্রেস হয়ে সোজা বিছানায় গিয়ে গড়াগড়ি খেলাম। এভাবে ঘন্টাখানেক পাড় করার পর দেখি পেটে মোচর ধরছে। হোটেলের তিনতলায় ছিল সুন্দর সাজানো গোছানো রেস্টুরেন্ট। খেতে গিয়ে জানলাম আগে থেকে অর্ডার করতে হবে। আবার রিসিপশনে গিয়ে রাতের খাবারের জন্য অর্ডার দিয়ে দিলাম। বললো সাড়ে আটটার মধ্যে রেডি হবে। আমাদের হাতে তখনও ঘন্টাখানেক সময় ছিল। ত্রিশ সেকেন্ড হাঁটলেই হোটেলের একদম সামনে সেভেন সিস্টার্স ঝর্ণা। যার গর্জন হোটেল থেকেই শুনতে পাচ্ছিলাম। অন্ধকারে হেটে গিয়ে দাঁড়ালাম সেখানে। অন্ধকার বললে ভুল হবে। আকাশে ভরা পূর্নিমার চাঁদের আলো অপার্থিব এক পরিবেশ তৈরী করে রেখেছিল। সামনে সেভেন সিস্টার্স ঝর্ণার আভাস দেখা যাচ্ছিল দুধ সাদা রেখার মত। কিন্তু গর্জন কানে বাজছিল। ওখানেই মন্ত্রমুগ্ধের মত কাটিয়ে দিলাম বাকি সময়টা। মনে মনে এটা ভেবে শিহরিত হচ্ছিলাম যে, না জানি সকালে এটার রূপ দেখে কতটা মুগ্ধ হবো।

40496289_10209578422736458_9094377702051282944_o
চেরাপুঞ্জিতে আমাদের হোটেল সেভেন সিস্টার্স ভিউ ইন।
40451714_10209578495258271_507485269746778112_o
সেভেন সিস্টার্স ফলস
40454762_10209578685863036_3994298990911815680_n
হোলের বেলকনি থেকে ভিউ
40390834_10209578390535653_6513060399619768320_n
ওই ছাউনির ওপারেই বাংলাদেশ
40485024_10209578593260721_3743735611090010112_n
হোটেলের ছাদ থেকে ভিউ
40482552_10209578681142918_1608419541015068672_n
হোটেলের সামনের রাস্তা
40417701_10209578502178444_1150874995639975936_n
এই ছাউনি থেকে সেভেন সিস্টার্স ফলস দেখতাম।

সাড়ে আটটায় রেস্টেুরেন্টে গিয়ে আবার বসলাম। মিনিট দশেক পর খাবার চলে এলো। আমরা নিয়েছিলাম, ফ্রাইড রাইস সাথে চিকেন গ্রিল। খাবারের স্বাদ ছিল ১০/৭। ক্ষুধা পেটে না খেলে হয়তো ১০/৬ দিতাম। খেয়ে দেয়ে আবারও গেলাম ঝর্ণার সামনে। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে রুমে ফিরে এলাম। কারণ ততক্ষণে চোখ আর চোখের জায়গায় থাকছিল না। হারিয়ে যাচ্ছিল ঘুমের অতল গহীণে।
ফ্রেস একটি ঘুম দিয়ে সকালে উঠলাম। সকাল বলতে মোটামুটি ভোরেই। আগের দিন রাতেই সকালের খাবারের অর্ডার করে রেখেছিলাম। আলু পরাটার সাথে ছোলা বাটোরা। অসাধারণ ছিল সেই খাবার। খেয়ে দেয়ে বাক্সপেটরা নিয়ে সোজা গাড়িতে। ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি। চুক্তি অনুযায়ী সমরজিতে সাথে আমাদের আগের দিন রাতেই হিসাব নিকাশ শেষ হয়ে গিয়েছিল। প্ল্যান ছিল পরদিন নিজেরাই আরেকটি সমু জীপ ভাড়া করে চেরাপুঞ্জির স্পটগুলো দেখতে দেখতে শিলং চলে যাবো। কিন্তু আগের দিন রাতে সমরজীত যখন বললো, দাদা আপনাদের ভালো লেগেছে। আপনারা চাইলে আমি আপনাদের সাথে বাকি দিনগুলো থাকতে পারি। তখন আমরাও একটু বিবেচনায় আনলাম বিষয়টা। প্রতিদিন সকালে উঠে গাড়ি খোঁজার প্যারা না নিয়ে একটু রিলাক্স থাকা যায়, যদি সমরজীতের সাথে রাজি হয়ে যাই। সুতরাং আলোচনা আগালাম। ডাউকি থেকে চেরাপুঞ্জি, চেরাপুঞ্জি থেকে সিলং, সিলং একদিন পুরোটা সময় সাইট সিন, তারপর শিলং থেকে ক্রাংসুরি ঝর্ণা দেখে আবার সোনাংপেডেং গিয়ে সমরজিতকে ছেড়ে দেব। এর মধ্যে যত ভিউ পয়েন্ট এবং স্পট দেখতে চাইবো সব দেখাবে। এই চুক্তিতে তার সাথে ভাড়া মেটালাম ১৩ হাজার রুপি। লাভ লস আর ঘাটলাম না। আপনারা যারা অভিজ্ঞ তারা হিসাবটা মিলিয়ে আমাকে বলবেন।
সমরজিত ওই দিন প্রথমেই আমাদের নিয়ে গেল মৌসমাই কেভ। এটি একটি গুহা। ঢুকতে ২০ রুপি করে জনপ্রতি টিকিট। স্টিল ক্যামেরার জন্য আলাদা ৫০ রুপি নিয়েছিল।
গুহাটি দারুণ এ্যাডভেঞ্চারপূর্ণ। পাড় হতে মিনিট দশেক সময় লেগে যাবে। তবে আমার কাছে ভীষণ হরর টাইপ মনে হয়েছে। গুহা দেখা শেষে আমরা চলে গেলাম একটি ইকোপার্কে। এখানে ১০ রুপি করে টিকিট। এখানে মূলত সেভেন সিস্টার্স ঝর্ণার উৎপত্তি দেখতে পারবেন। অর্থাৎ দূর থেকে যে সেভেনসিস্টার্স ঝর্ণা আমরা দেখেছি, সেই ঝর্ণার পানি কোথা থেকে এসে পাহাড়রের গা বেয়ে পড়ছে, তা এই পার্কে এলে দেখতে পারবেন। এক কথায় এখানে আপনি ঝর্ণার উপরে উঠে যেতে পারবেন। ভালো লাগবে।
এরপর আমরা চলে গেলাম নোহকালিকাই ফলস দেখতে। পথে অবশ্য রামকৃষ্ণ মিশন পড়েছিল। কিন্তু কেন জানি সেটা দেখার তেমন আগ্রহ আমাদের ভিতর ছিলনা।
নোহকালিকাই ফলসটা ছিল দারুণ। বিশেষ করে এই ফলস দেখে একটু সামনে হাঁটলেই একটি সুন্দর সবুজ ল্যান্ডস্কেপ পাবেন। অসাধারণ এই জায়গাটিতে টুরিস্টরা তেমন যান না। কিন্তু আমরা বাদ দেইনি। এখানে গিয়ে ছবি তোলা এবং চারপাশের পরিবেশ দেখলে আপনার ঘোর লেগে যাবে।

40457825_10209578558019840_6245769178741997568_n
নোহকালিকাই ফলস
40452009_10209578653142218_6037561297514528768_n
নোহকালিকাই ফলসের ভিউ পয়েন্টে টুরিস্টগণ
40483464_10209578539019365_4846968862387732480_n
কষ্ট করে একটু পড়ে নিন
40509521_10209578448337098_3158970333361340416_n
নোহকালিকাই ফলস দেখা শেষে একটু সামনে এগুলেই এই অসাধারণ ল্যান্ডস্কেপ পাবেন।

নোহকালিকাই ফলস দেখা শেষ করে আমরা চলে গেলাম গ্রীণ ভ্যালী ভিউ পয়েন্ট। এটি মূলত শিলং যাবার পথেই পড়বে। আমরা এই জায়গাটির নাম জানতাম না। এর অবস্থানও জানতাম না। আমাদের ড্রাইভার সমরজিত এটি নাকি আমাদের জন্য সারপ্রাইজ হিসেবে রেখেছিল। এটি আসলেই সারপ্রাইজ ছিল। চেরাপুঞ্জির সবগুলো স্পটের মধ্যে এটি আমাদের কাছে বেস্ট ছিল। ১০ রুপি করে টিকিট কেটে অনেকখানি উপরে ওঠার পর নীচে তাকিয়ে যা দেখলাম তা ভোলার নয়। চিন্তা করুন পাহাড়ের অনেকখানি উপরে ওঠার পর নীচে তাকিয়ে যদি দেখেন আপনি যে রাস্তায় এসেছেন সেই রাস্তাটিই দেখা যাচ্ছে, এবং সেখানে খেলনার মত সব গাড়ি ছুটে যাচ্ছে, তাহলে কেমন শিহরণ হবে আপনার। তবে এই জায়গাটিতে টুরিস্ট ছিলনা কোনো। আমরাই ছয়জন প্রাণ ভরে দেখে মজা নিয়ে চলে এলাম। ধন্যবাদ দিলাম সমরজিতকে।

40517535_10209578529699132_6555446542805762048_n
গ্রীণ ভ্যালি ভিউ পয়েন্ট
40461444_10209578676622805_8191236342735175680_n
গ্রীণ ভ্যালী ভিউ পয়েন্ট।
40330296_10209578569020115_3279100156313600000_n
ওই রাস্তায় এসেছি।
40514934_10209578615701282_6180334828001427456_n
রাস্তা যেন ডাকে আমায়।

এরপর গাড়ি ছুটে চললো ওয়াকাবা ফলসের দিকে। চেরাপুঞ্জিতে ফলসের শেষ নেই। সবগুলোই তাদের নিজ নিজ বৈশিষ্ঠ্যে উজ্জল। ওয়াকাবা ফলসের টিকিট মূল্য ২০ রুপি করে। এই ফলসটি দেখতে হলে অনেকটা পথ পাহাড়ের গা বেয়ে পাথরের সিঁড়ি ভেঙে আপনাকে নীচে নামতে হবে। আমরা তাই নামলাম। তারপর যা দেখলাম তা ছিল অসাধারণ। অনেকখানি উপর থেকে একটি ঝর্ণা ভীষণ গর্জন করে নীচে নেমে যাচ্ছে। ঝর্ণার পানিগুলো নীচে পড়তে পড়তে যেন ভেঙ্গে চুরে পাউডার হয়ে যাচ্ছে। তাই থেকে ঝর্ণার সামনেই মেঘ তৈরী হয়ে আছে। সবুজ ল্যান্ডস্কেপ ভিউ, সাথে সেই সাদা মেঘ, আহ্ । বর্ণনা করার মত নয়।

40371571_10209578448657106_3918630587803369472_n
ওকাবা ফলস এর পার্কিং
40457590_10209578647262071_5697802072703893504_n
এখান দিয়ে নেমে যেতে হবে।
40458276_10209578630541653_2778164213477015552_n
নামার পর বিষ্ময়, ওকাবা ফলস।

এবার আমাদের ডিরেক্ট শিলং যাবার পালা। তবে পথে একজায়গায় থেকে মম খেয়ে নিলাম বেশ কয়েকটা করে। আমাদের সেটিনের মত দুপুরের খাবার ছিল ওই। শিলং পৌছার আগে আমরা এলিফেন্ট ফলস দেখতে গেলাম। সমরজিত বললো, এই ফলসটা আমাদের শিলং সিটি টুরের মধ্যে আছে। কিন্তু আজ যেহেতু হাতে সময় আছে সুতরাং এটি দেখেই যাই। আমরাও না করলাম না।
এলিফেন্ট ফলসের ভিউটা ছিল কিছুটা আলাদা। এই ঝর্ণাটা অতটা বুনো ঝর্ণা নয়। আবার সৌন্দর্যের দিক দিয়েও একটু ব্যতিক্রম। তবে অবশ্যই অনেক সুন্দর। তবে এখানে প্রচুর টুরিস্ট হয়। মূলত দুইটি ঝর্ণা আছে এখানে। একটি অপেক্ষাকৃত ছোট এবং অপরটি বড়।

40560305_10209578587300572_9019358221256622080_n
এ্যালিফেন্ট ফলস ২য় টি।
40454763_10209578675182769_10571778531262464_n
এ্যালিফেন্ট ফলস ১ম টি।

এ্যালিফেন্ট ফলস দেখা শেষে আমরা যখন শিলং পুলিশ বাজার পৌঁছলাম, তখন সন্ধ্যা ৭টা বেজে গেছে। সমরজিত একটি জায়গা দেখে গাড়ি প্লেস করলো। আমি সাথে একজনকে নিয়ে গেলাম হোটেলের রুম ভাড়া করতে। খুব বেশি ঘাটলাম না। দু একটি দেখে হোটেল জারা রেসিডেন্সিতে দুইটি রুম নিলাম। প্রতি রুমে তিনজন করে থাকতে পারবো। ভাড়া রুপ প্রতি ১৫শো রুপি। খারাপ না। মেইন পুলিশ বাজারেই এটি ছিল। তারপর গাড়ি থেকে ব্যাগ নিয়ে হোটেলে উঠেই গোসল দিয়ে দিলাম। বাইরের তাপমাত্রা কিছুটা ঠান্ডা ছিল। তবে বাথরুমে গিজার ছিল। গরম পানি দিয়ে গোসল করে বেশ ফ্রেস লাগলো। সেই সাথে ক্ষুধাও। শিলং শহরে আটটার মধ্যে সব বন্ধ হয়ে যায়-এরকম কথা শোনার পর কিছুটা তারাহুড়া করে খেতে বের হয়ে জানলাম, সমস্যা নেই, খাবার হোটেল ১০টা পর্যন্ত খোলা পাবো। আমরা খেতে গেলাম সুরুচি নামে একটি হোটেলে। ভাতের সাথে মাছ খেলাম, কেউ কেউ ডিম খেলো। সাতজনে বিল দিলাম ১১০০ রুপি। একটু বেশিই মনে হলো। তবে খাবার ভালো ছিল।
খেয়ে দেয়ে শহরের ভিতর একটু চক্কর দিলাম। সব দোকান পাট সব বন্ধ হয়ে গেছে। তবে মেইন পয়েন্টে অনেকগুলো ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান পসরা সাজিয়ে বসেছিল। তাদের বেচাবিক্রিও দেখলাম খারাপ না। আইটেমের মধ্যে ছিল, মম, চিকেন গ্রিল, পরোটা ডিম, পর্ক গ্রিল, চাউমিন ইত্যাদি। আমরা কিছুই খেলাম না। কারণ ভরা পেট। তবে ঘুরে ঘুরে কিছুক্ষণ দেখলাম। তারপর সোজা হোটেলে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন আমাদের শিলং সিটি ট্যুর শুরু হবে।

(ধারাবিহক চলবে)

আমার মেঘালয় ভ্রমণ

 

পর্ব–০১
ঢাকা টু ডাউকি, মাউলিননং ভিলেজ, লিভিং রুট ভিলেজ

=================

ছোটবেলায় নাম শুনতাম- মেঘালয়। মেঘ+আলয়–এভাবে সন্ধি বিচ্ছেদ করে নিতাম মনে মনে। সেই সাথে মনের ভিতর একটি ছবি আঁকা হয়ে যেত, জায়গাটিতে মনে হয় শুধু মেঘ আর মেঘ। সেখানে মনে হয় মেঘেদেরই ঘর বাড়ি। মানুষজন মনে হয় মেঘ ধরে ধরে খায়। মেঘ গায়ে দেয়। হা হা হা।
বড় বেলায় যখন সেই মেঘের দেশ মেঘালয়ে গেলাম, তখন আমার সেই কল্পনার ছবির সাথে আরো এমন কিছু ছবি যোগ হলো, যা আমি কল্পনাও করতে পারিনি।
যাইহোক, কোরবানী ঈদের আগে কাজের বেশ চাপ যাচ্ছিল। তাই মনে মনে প্ল্যান করছিলাম ঈদের ঠিক পরপরই চলে যাবো কোথাও। কিন্তু কোথাও যাওয়া যায়? এরকম চিন্তা করতে করতেই মাথায় আসলো মেঘালয়ের কথা। বলাবাহুল্য, মেঘালয় থেকে আমি তখন মাত্রই কিছুদিন আগে ঘুরে গিয়েছি। কিন্তু আমার সাধ মেটেনি। মনে হয়েছে আরো একবার মেঘালয়ে না গেলে কিছুতেই হবেনা। তাছাড়া ভ্রমণের ক্ষেত্রে আমার কোনো বাছ-বিচার নেই। হুট-হাট চলে যাবো কোথাও। কোনো টাইম টেবিল থাকবে না। যতদিন ইচ্ছা, যতক্ষণ ভালো লাগে থেকে চলে আসবো। একই জায়গায় একবার গিয়ে মন না ভরলে বার বার যাবো। কিন্তু যেতে আমাকে হবে। ছুটতে আমাকে হবেই। আমার কাছে থেমে থাকা মৃত্যুর সামিল। আর ছুটে চলাই জীবন। আহা জীবন ! কতদিন আর বাঁচবো? একদিন শুনবেন, রাজিব ফেরদৌস মরে গেছে!
যাইহোক, অনেক বকবক করলাম। এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। মেঘালয় যাবো তাই মেঘালয়ের জন্য তোরজোড় শুরু করে দিলাম। প্রথমবার যখন মেঘালয় ঘুরে এসেছিলাম, তখন বন্ধু তালিকার অনেকেই ধরেছিল, ভাই এরপর যদি যাও তবে অবশ্যই একবার অন্তত জানিয়ো। যাই না যাই তখন দেখা যাবে।
ফলে মেঘালয় নিয়ে যাদের আগ্রহ দেখেছিলাম, তাদের নিয়ে ছোট করে একটি সিক্রেট গ্রুপ খুললাম। সেখানে আলোচনা হতে থাকলো কে যাবে আর কে যাবেনা। তবে আমি যাচ্ছি এটা নিশ্চিত। প্রথম অবস্থায় ১২ জনের মত আগ্রহ প্রকাশ করলো। কিন্তু সমস্যা হলো ভিসা নিয়ে। এই ১২ জনের কারো ভিসা আছে, কারো নেই। কারো আবার ভিসা আছে অন্য পোর্ট দিয়ে। শেষ পর্যন্ত ভিসা সংক্রান্ত গ্যাড়াকলে পড়ে ১২জন থেকে ৬জন বাদ পড়ে দল গিয়ে দাঁড়ালো ৬ জনে। ফাইন। কোনো এক জায়গায় ট্যুরের জন্য ৬ জনের দল খারাপ না। এই ৬ জনের ভিতর আমিই একমাত্র ব্যাক্তি যে আগে একবার মেঘালয় ভ্রমণ করে গেছি। সুতরাং আমার উপর দায়িত্ব পড়লো অনেক।
আমরা ভ্রমণের তারিখ ঠিক করলাম ২৫ আগস্ট রাতে। ২২ আগস্ট কোরবানীর ঈদ। ঈদে সবাই বাড়ি যাবে। ঘুরে আসতে আসতে দুই তিনদিন লেগে যাবে। সুতরাং ২৫ আগস্ট পারফেক্ট আমাদের জন্য। আগে থেকে ইউনিক গাড়ির টিকিট কেটে রাখলাম। ঢাকা থেকে সিলেটের নন এসি ইউনিকের টিকিট জনপ্রতি ৪৭০টাকা করে। নন এসি একারণে কাটলাম যে, আমরা ভ্রমণ করবো রাত ১২টার দিকে। তখন এমনিতেই ওয়েদার ঠান্ডা ঠান্ডা থাকে। তারউপর বাসের জানলা খুলে দিলে তো পুরো কাপুনী ধরে যায়। আর বাসের জানলা খুলে, কানে ইয়ারফোন গুঁজে, চুলে বাতাস লাগিয়ে, রবীন্দ্র সংগীত শুনতে শুনতে দূর পাল্লার ভ্রমণে যে মজা তা আমি এসি বাসের বদ্ধ পরিবেশে কোনো দিনই পাইনা।
নির্ধারিত দিনে অর্থাৎ ২৫ আগস্ট বিকাল থেকে আমরা ৬ জন মেঘালয় যাত্রী বাড়ি থেকে ঢাকা এসে জমা হলাম। যার যার বাসায় চলে গিয়ে, ব্যাগপত্র গুছিয়ে ইউনিকের মুগদা কাউন্টারে চলে আসলাম সবাই রাত সাড়ে ১১টার মধ্যে। তখনো বাস ছাড়তে ঘন্টাখানেক বাকি। আমাদের বাস সাড়ে ১২টার। এত দেরীতে টিকিট ইচ্ছে করেই কেটেছি। এর একটা কারণ আাছে। আমরা প্রথমে যাবো ঢাকা থেকে সিলেট। আর এই পথ ৬ ঘন্টার বেশি লাগেনা। আমরা যদি সাড়ে বারোটায় বাসে উঠি তো আমাদের সিলেট নামিয়ে দেবে ভোর সাড়ে ছয়টার দিকে। তবুও অনেক সকাল হয়ে যায়। ওখান থেকে সকালের নাস্তা করে আমরা যদি সাতটার মধ্যে একটা টেম্পু নিয়ে ডাউকি বর্ডারের দিকে রওনা দেই তো সেখানে দুই থেকে আড়াই ঘন্টা লেগে যাবে। তার মানে আমরা ঠিক নয়টা থেকে সাড়ে নয়টার মধ্যে বর্ডারে পৌঁছবো। পারফেক্ট টাইম। কারণ বর্ডার খোলে নয়টায়। আর আমরা যদি ঢাকা থেকে ১০টা বা তারও আগে রওনা দেই, তো সিলেট পৌছবো ভোর ৪টার দিকে। এত ভোরে না কোনো কিছু খোলা পাবো, না বর্ডারে গিয়ে কোনো লাভ হবে। শুধু শুধু কাউন্টারে বসে ভোর হবার জন্য বেকার অপেক্ষা করতে হবে। সুতরাং মেঘালয় যাওয়ার জন্য আমাদের বাসের টাইমটি পারফেক্ট সিলেকশন ছিল।
ঠিক রাত সাড়ে বারোটায় আমাদের বাসটি সিলেটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে দিল। কিছুদূর যেতেই বৃষ্টি শুরু হলো। নিমিষেই ঠান্ডা লাগতে শুরু করলো। তখন জানলাটাও আর খুলে রাখা গেলনা। বন্ধ করে দিয়ে চোখ বুঝে গান শুনতে শুনতে পৌঁছে গেলাম, উজান ভাটি রেস্টুরেন্টে। ঘড়িতে তখন রাত আড়াইটা। এই রেস্টুরেন্টে বিশ মিনিটের যাত্রা বিরতি। আমরা নেমে একটু ফ্রেস হয়ে নিলাম। তবে এখান থেকে খেলাম না কিছুই। এইসমস্ত হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে খাবার আগে আপনাকে একটু হিসাব নিকাশ করে নিতে হবে। টাকার মায়া যদি না করেন তো এখানে বসে ভুরিভোজটা সেরে নিতে পারেন। আর যদি আপনার মনে হয়, টাকাটা খুব কষ্টে কামিয়েছেন, তো অযথা এদের বলির পাঠা হবার কোনো প্রয়োজন নেই। এরা ছোট দুই পিছ মুরগির মাংসের দাম রাখে ১৯০ টাকা। বাকিসব একই অবস্থা। বড়জোর এখানে নেমে ফ্রেস হতে পারেন, আর টয়লেটে গিয়ে কিছু ত্যাগ করতে পারেন। যা পরিস্কার করতে পরবর্তীতে উল্টো ওদেরই টাকা খরচ হবে। হা হা হা।
তবে ক্ষুধা লাগলে সাথে কিছু শুকনা খাবার রাখতে পারেন। আর পানি। ৬ ঘন্টার জার্নি ওগুলো দিয়ে আপনার দিব্যি চলে যাবে।
সিলেট বৃষ্টির শহর। এখানকার বৃষ্টি নামার কোনো টাইমবেলি নাই। সুতরাং যারা সিলেট হয়ে মেঘালয় যাবেন, তারা আর কিছু নেন বা না নেন, ব্যাগের ভিতর একটা ছাতা ঢুকাতে ভুলবেন না। আমরা যখন ভোর ছয়টায় সিলেট বাস স্ট্যান্ড পৌঁছে গেলাম, তখন দেখি সেখানে তুমুল বৃষ্টি। অগত্যা ব্যাগ থেকে ছাতা বেড় করে কাউন্টারে গিয়ে জড়ো হলাম। তবে বৃষ্টি নামার অপেক্ষা করলে চলবে না। এ দেশে এভাবেই চলতে হবে।
আমি সাথে একজনকে নিয়ে ছাতা নিয়ে বের হলাম। বাকিরা কাউন্টারে অপেক্ষা করতে লাগলো। আমাদের টার্গেট তামাবিল বর্ডার পর্যন্ত যাওয়ার জন্য আগে একটা লেগুনা খুঁজে বের করা। ইউনিক গাড়ি আমাদের নামিয়ে দিয়েছে সিলেটের কদমতলী বাসস্ট্যান্ডে। ওখান থেকে বর্ডার পর্যন্ত যেতে বাসও পাওয়া যায়। কিন্তু রাস্তা খুব একটা ভালো না হওয়ায় বাসে যাওয়ার সাহস করলাম না। তাছাড়া ওগুলো লোকাল বাস। ভিতরে জায়গা কম। দুই আড়াই ঘন্টার জার্নিতে শরীর কাহিল হয়ে যেতে পারে। আর লেগুনায় গেলে একটু রিলাক্সে সবাই গান বাজনা কিংবা কথা বলতে বলতে যেতে পারবো।
বাইরে বৃষ্টি হওয়ার কারণে লেগুনাও খুব একটা দেখা যাচ্ছিলনা। যে দু একটা পাচ্ছিলাম, সেগুলো যাবেনা বললো। শেষে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে একটি পেলাম, ভাড়া চাইলো ১৬ শো টাকা। দরদাম করাতে ১৪শো টাকায় রাজি হলো। অন্য সময় হলে ১২ শো তেই হয়ে যেত। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, তখন ইদের পর। কি আর করা সবাইকে ডেকে এনে লেগুনায় উঠলাম। তবে লেগুনাকে শর্ত দিয়েছিলাম। আগে আমাদের নিয়ে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী পাঁচভাই রেস্টুরেন্টে সকালের নাস্তা করাতে হবে, তারপর বর্ডারের দিকে রওনা দিতে হবে। সে একটু গাইগুই করলেও শেষে রাজি হয়েছিল।
পাঁচভাই রেস্টুরেন্টে আমরা সকালের নাস্তা করলাম ভুনা খিচুরি, মুরগীর মাংস আর আচার দিয়ে। খাবারটা দারুণ ছিল। ৬ জনের বিল উঠলো মাত্র ৩৬০ টাকা। খুব সস্তা। পেট শান্তি তো দুনিয়া শান্তি। এবার গিয়ে লেগুনায় বসে পড়লাম। লেগুনা সোজা বর্ডারের দিকে যাত্রা করলো।
সকাল সাড়ে আটটায় গিয়ে আমরা তামাবিল বর্ডারে পৌঁছলাম। অর্থাৎ ওপাশে ইন্ডিয়ার দিকে ডাউকি বর্ডার আর এপাশে বাংলাদেশের দিকে তামাবিল বর্ডার। এই দুইটা বর্ডার আমাদের পাড় হয়ে মেঘালয়ে ঢুকতে হবে। বর্ডার তখনও খোলেনি। তবে আমি মনে মনে যে বিষয়টি নিয়ে একটু শংকিত ছিলাম, বর্ডারে পৌঁছানোর পর তা কেটে গেল। ভেবেছিলাম, ঈদের পর, না জানি কত শত লোক থাকবে। কিন্তু দেখলাম বর্ডার প্রায় ফাঁকা। নয়টায় যখন বর্ডার খুললো, তখন আমরা ৬ জনসহ মাত্র ২০/৩০ জন মানুষ ছিলাম। আমাদের কাজ দ্রুত হয়ে গেল। তবে আমাদের ভিতরের একজন ট্রাভেল ট্যাক্স ঢাকা থেকে জমা না দিয়ে আসার কারণে ওখানে জমা দিল। তবে আপনারা অবশ্যই ট্রাভেল ট্যাক্স ঢাকা থেকে জমা দিয়ে আসার চেষ্টা করবেন।
ইন্ডিয়ার সাইট অর্থাৎ ডাউকি বর্ডার পার হতেও আমাদের খুব একটা সময় লাগলো না। সব মিলিয়ে আমাদের ৪৫ মিনিট লাগলো দুইটি বর্ডার পার হতে।
এরপর আমরা ইন্ডিয়াতে। এখানকার ভাষা চেঞ্জ, মানুষজন চেঞ্জ, গাড়ির নম্বরপ্লেট চেঞ্জ, এমনকি মুহূর্তেই ঘড়ির টাইম চেঞ্জ আধা ঘন্টা। অথচ একই মাটি, একই আকাশ, একই বাতাস। এইপাশের পাখিগুলো উড়ে গিয়ে পড়ছে ওই পাশে। এই পাশের পানি বয়ে গিয়ে পড়ছে ওই পাশে। তবুও সীমানা বলতে একটা কথা থেকেই যায়। যা সবকিছু থেকে আলাদা করে রেখেছে দুইটি দেশকে। সে আমরা মানি আর না মানি।

38404415_10209425138664452_7243641912991678464_o
ডাউকি বাজার

মেঘালয় আসার প্ল্যানে আমাদের একটা বিশাল ভুল ছিল। জেনে শুনেই আমি সেই ভুল করেছিলাম। উপায় ছিলনা। আমরা রওনা দিয়েছিলাম শনিবার রাত সাড়ে বারোটায়। পরদিন অর্থাৎ রবিবার সকালে আমরা ডাউকি পৌছি। পৌঁছেই একটা ধাক্কা খেলাম। রবিবার এখানে হলিডে। সবকিছু বন্ধ। আমাদের কাছে ডলার ছিল। যা বাংলাদেশ থেকে নিয়ে এসেছিলাম। সেগুলো এখানে ভাংগানো দরকার। কিন্তু কোথাও মানি এক্সচেঞ্জের দোকান খোলা পেলাম না। আবার আমরা এখান থেকে চেরাপুঞ্জি যাবো। কিন্তু গাড়ি নেই বললেই চলে। যে দু একটা আছে আকাশছোয়া ভাড়া চেয়ে নির্বিকার বসে থাকলো। আমার মাথায় বাজ পড়লো। মেঘালয় ঢুকতেই এত বড় সমস্যায় পড়লাম। না জানি দলের সদস্যদের মনের কি অবস্থা হবে এবার। তবে ভেঙ্গে পড়লাম না। কাউকে বুঝতে দিলাম না। এক্ষেত্রে আমি আমার বিগত ভ্রমণগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগালাম। সমস্যা যতই আসুক, ঠান্ডা মাথায় মোকাবেলা করতে হবে। বিদেশ ভ্রমণে এটাই আমার মূল মন্ত্র। একটি স্টেশনারী টাইপ দোকান শুধু খোলা ছিল। প্রথমেই ওখানে গিয়ে ঠান্ডা জুস কিনে সবাইকে খাইয়ে ঠান্ডা করলাম। তারপর ওই দোকানের দিদিকে রিকোয়েস্ট করলাম আমাদের কাছে ডলার আছে, ওখান থেকে কিছু ডলার নিয়ে রুপি দিতে। দিদি রিকোয়েস্টের কাছে নত স্বীকার করলেন। না করলেন না। দিয়ে দিলেন। আমরা প্রয়োজনীয় কিছু রুপি নিয়ে নিলাম।

38420309_10209425122984060_5719936001980235776_o
ডাউকি বর্ডারে এই একটি দোকানই খোলা পেয়েছিলাম।

এরপর শুরু হলো গাড়ি খোঁজা। গাড়ি নেই। দু একটা পাচ্ছিলাম, কিন্তু যাবেনা। মহ মুশকিলে পড়ে গেলাম। প্রায় দুই ঘন্টা অপেক্ষা করার পর একটা গাড়ি পাওয়া গেল। তাও প্যাসেঞ্জার বোঝাই। সে বলে গেল, অপেক্ষা করেন, আমি যাত্রী বর্ডারে নামিয়ে দিয়ে এসে আপনাদের সাথে কথা বলবো।
কি আর করা অগত্যা অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিন্তু ওই গাড়ি আর আসেনা। অথচ আমারা যেখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম, ওখান থেকে বর্ডার মাত্র দুই কিলোমিটার। প্রায় আধঘন্টা পর, যখন আমরা ওর আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম, তখন দেখি ও আসছে। বেশি কথা না বলে ওকে ঠিক করে ফেলাম। ভাড়া অনেক বেশি পড়লো। ৫ হাজার রুপি। আমাদের নিয়ে চেরাপুঞ্জি যাবে, সাথে রাস্তায় যতগুলি স্পট আছে সব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাবে। অন্য সময় হলে অবশ্য এই চুক্তিতেই গাড়ি ভাড়া হতে পারতো সর্বোচ্চ ৪ হাজার টাকা। যাই হোক, গাড়ি যে পেয়েছি এটাই স্বান্তনা। ড্রাইভারের নাম সমরজিত। বয়স ৩০ এর আশে পাশে। লম্বা লিকলিকে চেহারা। ভালো বাংলা বলতে পারে। ওর আগের প্রজন্ম নাকি সিলেটের বাসিন্দা ছিল। এই সমরজিত পরবর্তীতে আমাদের এই মেঘালয় ট্রিপের জন্য যে কতটা হেল্পফুল ছিল তা বলে বুঝাতে পারবোনা। মনে রাখবেন বিশেদ ভ্রমণে একটি ভালো ড্রাইভার মিলে যাওয়া খুবই জরুরী। একজন ভালো ড্রাইভার যেমন আপনার জন্য একজন ভালো গাইড হিসেবে কাজ করবে তেমনী লোকাল সব ধরণের সমস্যা সে নিজের করে নেবে এবং আপনাকে সাপোর্ট দেবে।

40513975_10209578291293172_5666001563613659136_o
এই সেই আট সিটের টাটা সমু জীপ। 

যাক, বর্ডার পার হলাম, গাড়ি পেলাম। এবার শুধু ছুটে চলা। প্রথমেই আমরা যাবো মাউলিননং ভিলেজ। এশিয়ার সব থেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন গ্রাম হিসেবে যা গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে ধারাবাকিভাবে স্থান করে নিচ্ছে।
ডাউকি থেকে রওনা দিয়ে মাত্র মিনিট দশেক সামনে এসেছি, দূর থেকেই শুনতে পাচ্ছিলাম ঝর্ণার গর্জন। কাছে আসতেই সবার চোখ ছানাবড়া। রাস্তার সাথেই এত বিশাল একটি ঝর্ণা তার মোহনীয় রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। এই ঝর্ণাটির নাম উমক্রেম ফলস। ঝর্ণা দেখেই আমরা গাড়ি থামালাম। ট্যুর মেটরা সবাই লাফিয়ে নামলো গাড়ি থেকে। কেউ ছবি নিলাম, কেউ ঝর্ণার ঠান্ডা পানিতে গা ভিজিয়ে গত রাতের জার্নির সব ক্লান্তি নিমিষেই দূর করলাম।

40406616_10209578604060991_6795440622292434944_o
সবুজের ভিতর এক চিলতে প্রশান্তি। উমক্রেম ফলস।
40524096_10209578291733183_270255040369786880_o
এই সেই অপরূপ সুন্দর উমক্রেম ফলস।

প্রায় আধঘন্টার মত কাটালাম আমরা উমক্রেম ঝর্ণায়। তারপর আরেকটু সামনে এগিয়ে পেলাম আরো একটি মোহনীয় ঝর্ণা। এটার নাম বরহিল ফলস। এটি বাংলাদেশের পান্থুমাই থেকে দেখা যায়। সামনে একটা স্টিলের ব্রিজ রয়েছে। ওই ব্রিজের উপর থেকে ঝর্ণাটির সৌন্দর্য উপভোগ করতে হয়। এই ঝর্ণার পাদদেশে নামা যায়না। না যাক, তবুও এর সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। আমার ট্যুর মেটরা মেঘালয় ঢুকেই প্রথমেই এত বিশাল আর এত সুন্দর দুইটি ঝর্ণা দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লো। তারা কল্পনাও করতে পারেনি, এত দ্রুত এত বড় বড় দুটি সারপ্রাইজ তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সবাই ঝর্ণার সৌন্দর্য দেখে আর ঝর্ণার ঠান্ডা পানিতে নিজেদের ভিজিয়ে চাঙ্গা হয়ে গেল। ফলে পুর্ণোদ্যেমে আমরা ছুটে চললাম মাউলিননং ভিলেজের দিকে। ডাউকি থেকে যার দূরত্ব ৩০কিলোমিটার। হোক, এখন আমরা হাজার হাজার দূরত্ব পাড়ি দিতে পারবো, যদি পেটে এবার কিছু একটা পড়ে শুধু।

40449647_10209578426256546_4041575499825152000_o
এটি হচ্ছে মায়াময় বরহিল ফলস
40454441_10209578267012565_946017910457892864_o
প্রশান্তির অপর নাম বরহিল ফলস

আমাদের গাড়িটি ছিল টাটা সমু জীপ। আটসিটের গাড়িতে আমরা ছয়জন বেশ আরাম আয়েসেই বসেছিলাম। আমাদের ড্রাইভার সমরজিত যখন আমাদের নিয়ে ক্লিন ভিলেজে পৌঁঁঁছলো, তখন ঘড়িতে বাজে ইন্ডিয়ান টাইম দুইটা। পেট ক্ষুধায় চো চো করছিল। গাড়ি থেকে নেমেই আগে সোজা চলে গেলাম একটি রেস্টেুরেন্টে। ক্লিন ভিলেজে বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট আছে। কিন্তু রবিবার হওয়ায় প্রায় সবগুলোই বন্ধ ছিল। তবে সেটা খোলা ছিল, সেটা খুব সুন্দর ছিল। অন্য দিন আসলেও আমি এই রেস্টুরেন্টটাকে বেছে নিতাম। এই রেস্টুরেন্টের সব ওয়েটার মেয়ে। পাহাড়ী সেইসব মেয়েরা তাদের ট্রেডিশনাল ড্রেস পড়ে টেবিলে টেবিলে খাবার বিলিয়ে যাচ্ছে। দেখতে অনেক সুন্দর লাগে। আর রেস্টুরেন্টের পরিবেশটাও দারুণ। খোলামেলা আর পরিষ্কার। খাবারের মেনুতে আমরা যোগ করলাম সাদা ভাত, মাছ, ডিম, মুরগির মাংস, সবজি আর ডাল। তবে যাদের হালাল হারামের সমস্যা আছে তারা একটু বুঝে শুনে খেতে পারেন। আমি মাছ, সবজি আর ডাল দিয়ে পেট পুরে খেয়েছিলাম। ওখানকার কাচামরিচে মারাত্মক ঝাল। তাই তরকারী যা খাবেন, সবই একটু ঝাল মনে হবে। তবে আমার এসবে কোনো সমস্যা নেই। খেয়ে দেয়ে সব সাফা করে দিলাম। খাবার অনেক মজা ছিল।

40454431_10209578364455001_6676094751130779648_o
মাউলিননং ভিলেজ। দ্যা ক্লিনেস্ট ভিলেজ অব এশিয়া।
40427401_10209578575140268_3059311080456060928_o
মাউলিননং ভিলেজের সেই রেস্টুরেন্ট

৬জন খাওয়া শেষে বিল করলাম ৮৭০ রুপি। হ্যাঁ, এবার থেকে সব রুপিতে হিসেব হবে। অর্থাৎ আমাদের গাড়ি ভাড়া ৫ হাজার রুপি থেকে শুরু হয়েছে। হোটেলের বিল পরিশোধ করে বের হলাম। ক্লিন ভিলেজ একটু ঘুরে ঘুরে দেখলাম। অর্থাৎ পায়ে হেঁটে। সত্যিই অনেক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এ ব্যাপারে এরা খুব সচেতন। আসলে সচেতনতাই যে একটি জাতিকে আলাদা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করে তুলতে পারে তার বড় উদাহরণ এই মাউলিণনং ভিলেজ। এরা অহেতুক কোনো জিনিস রাস্তাঘাটে ফেলবে না। একটু পর পর রাস্তার পাশে বাঁশ দিয়ে ঝুড়ির মত করে ডাস্টবিন দেয়া আছে। সবাই কষ্ট করে ওখানেই ময়লা আবর্জনা ফেলবে। শুধু তাই নয়, এরা পোষাকে আষাকেও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ব্যবহারের দিক থেকেও দশে দশ।
মাউলিননং ভিলেজ থেকে বের হয়ে আমরা চলে গেলাম লিভিং রুট ব্রিজ দেখতে। অর্থাৎ জীবন্ত গাছের শিকড় বাকড় দিয়ে শত শত বছর ধরে এই রুট বিজ্র তৈরী হয়েছে। এখানে যেতে হলে গাড়ি আপনাকে বেশ কিছুটা দূরে নামিয়ে দেবে। তারপর সেখান থেকে একটু ট্রেকিং করে পাহাড় বেড়ে আপনাকে সিড়ি ভেঙ্গে নিচে নামতে হবে। তেমন সমস্যা হবার কথা নয়। জাস্ট একটু হাপিয়ে উঠবেন এই আরকি। তবে নিচে নামার পর ভালো লাগবে। রুট ব্রিজের নীচ দিয়ে ঠান্ডা পানির ঝিরি বয়ে যাচ্ছে। ব্রিজটাও দেখতে সুন্দর। ওখানে আমরা বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে, ছবি তুলে আবার গাড়িতে ফিরে এলাম। তবে ওই পাহাড়ী ঢাল বেয়ে উপরে ওঠাটা একটু ঝক্কির ব্যাপার। যাদের শ্বাস কষ্টের সমস্যা আছে, তারা একটু চিন্তা করে উঠা নামা করতে পারেন।

40407590_10209578528099092_2439366683383562240_o
লিভিং রুট ব্রিজ এই দিকে।
40433210_10209578391095667_7050164090257276928_o
এই সেই লিভিং রুট ব্রিজ।
40442043_10209578437136818_7680548156961980416_o
লিভিং রুট ব্রিজের নিচ দিয়ে স্বচ্ছ পানির ঝিরি।

সমরজিৎ আমাদের জন্য গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। এইদিকে আমাদের ক্লোজ। মানে আর কিছু দেখবো না। এবার সোজা চলে যাবো চেরাপুঞ্জি। গাড়িতে উঠে বসলাম সবাই। সমরজিত হালকা সাউন্ডে পুরনো দিনের হিন্দি গান ছেড়ে দিল। ততক্ষণে ক্লান্তিতে সবার চোখেই একটু ঘুম চলে আসছিল। ফলে সাবই সিটে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করলো। আমি তাকিয়ে রইলাম বাইরের অপার সৌন্দর্যের দিকে। ভ্রমণে আমার কোনোদিনও চোখ বন্ধ হবেনা। পাহাড়ের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম। একটি পাহাড়ের বাঁক শেষ হলেই আবার ম্যাজিকের মত আরেকটি গাড় সবুজ পাহাড় এসে সামনে দাঁড়াচ্ছে। অপার্থিব এক মায়াময় পরিবেশে গাড়ি এগিয়ে চলছে। যতই সামনে এগিয়ে যাচ্ছি ততই বিষ্ময় আর বিষ্ময়। মনে হচ্ছে বিশাল বড় এক প্রাকৃতিক ক্যালেন্ডারের ছবির ভিতর আমরা ঢুকে যাচ্ছি। আহ কি সেই রূপ, কি সেই সৌন্দর্য!!

(ধারাবাহিক চলবে)

40570055_10209578375215270_1707561404980002816_o
চেরাপুঞ্জির দিকে।

ভূ-স্বর্গ কাশ্মিরে আমি

 

প্রথম পর্ব

ঢাকা টু কোলকাতা

=========================
শুরু হলো আমার নতুন ধারাবাহিক। গত ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ প্রায় ১৫দিনের কাশ্মীর লেহ-লাদাখ এবং মানালী ট্যুরে এক ম্যারাথন জার্নির সফল সমাপ্তি ঘটে ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে। সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই ট্যুুরের একটি বিস্তারিত ধারাবাহিক আমি লিখবো পর্ব আকারে। আসলে আমি সংক্ষেপে কিছু লিখতেও পারি না। আমি চাই ট্যুরের সমস্ত কিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরি। কিন্তু সেটা আপনাদের বিরক্তির কারণ হলে জানাবেন, আমি সংক্ষেপ করার চেষ্টা করবো।
আশা করি আপনারা পড়ে মতামত দিবেন। আর দোয়া করবেন, যেন ধারাবাহিকটি সফলভাবে শেষ করতে পারি।
==========================

আমাদের বাসটি, যেটি করে আমরা বেনাপোল যাবো, সেটি ফকিরাপুল থেকে ছাড়ার নির্ধারিত সময় ছিল রাত সাড়ে দশটা।
আমি বলছি ৪ সেপ্টেম্বর রাতের কথা। আমাদের একটি স্বপ্ন পূরণের যাত্রার কথা। যে যাত্রায় আমরা একাত্ম হয়েছিলাম ১৬ টি প্রাণ।
আমরা ভেঙ্গে ভেঙ্গে সুবিধামত যে যার জায়গা থেকে বাসে উঠবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। তবে বেশিরভাগই পছন্দ করেছিলাম কলাবাগান বাসস্ট্যান্ড। আমাদের বাসের নাম ছিল-রয়েল কোচ। বলা যায় ব্যক্তিগতভাবে রয়েল কোচে আমার প্রথম কোথাও ভ্রমণ। সেই সাথে ভারতবর্ষেও সেটি ছিল আমার প্রথম যাত্রা। তাই সব মিলিয়ে আমি ভীষণ এক উত্তেজনায় ছিলাম।
উত্তেজনার আরো একটি অন্যতম কারণ ছিল। সেটি হলো–এই ট্যুরের সবাই আমার অপরিচিত। ট্যুরের প্রায় সপ্তাহ খানেক আগে অবশ্য কতিপয় কয়েকজনের সাথে টিএসসিতে গিয়ে পরিচয় হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। কিন্তু সেখানে সেদিন সবাই আসেন নি। তাই ট্যুর শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত মনে একটি অজানা শংকা কাজ করতো, কি জানি সবাই কেমন হবে। সবার সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারবো কি না। কিংবা নিজেকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারবো কিনা, ইত্যাদি ইত্যাদি।
তবে সাহস পেতাম রবীন্দ্রনাথের সেই গানটি শুনে–

“অচেনাকে ভয় কি আমার ওরে–
অচেনাকে চিনে চিনে উঠবে জীবন ভরে।”

22104744_10207635001272136_7631313475033333621_o
রয়েল কোচের কাউন্টারে বাসের অপেক্ষায়

সত্যি এই অচেনাকে চিনে চিনেই আমার জীবনটা ভরে উঠেছিল এই ট্যুরে। তার প্রমাণ আপনারা আস্তে ধীরে পেয়ে যাবেন।

তো যা বলছিলাম। আমি কলাবাগান গিয়ে পৌঁছলাম মোটামুটি নয়টা নাগাদ। কাউন্টার খুঁজে বের করে ঢুকতে গিয়েই ইমরান ভাইর সাথে গুতা খেলাম। ভাই তার স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে আমাকে বুকে টেনে নিলেন। এই একটা টেকনিকে ভাই খুব দ্রুত আমার আপন হয়ে উঠেছিলেন সেই টিএসসিতে যেদিন প্রথম দেখা হয় সেদিনই। কলাবাগান কাউন্টারেও ভাইকে আগের মতই আন্তরিক হতে দেখে মনের সংশয় অনেকটা ‍দূরীভূত হলো।
বাকি মেম্বারদের সাথে অবশ্য ফেসবুকের কল্যাণে টুকটাক কুশল বিনিময় হয়েছে। সেদিন কলাবাগন কাউন্টারে তাদের প্রায় সিংহভাগকে পেয়ে প্রথমেই সহজ হয়ে নিয়েছিলাম।
ফকিরাপুল থেকে গাড়ি ছেড়ে যখন আমাদের কলাবাগান কাউন্টারে গাড়ি চলে এলো তখন রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে। আমরা বেশ আড্ডা দিচ্ছিলাম কাউন্টারে বসে। ফলে আমরা যারা অনেক আগেই কাউন্টারে পৌঁছে গেছি তাদের এই বাসের দীর্ঘ বিলম্বে কোনোপ্রকার বিরক্তি লাগেনি। আর এই বিরক্তি না লাগার ব্যপারটা আমাদের ট্যুরের শেষ পর্যন্ত বজায় ছিল।
বাস ছেড়ে দিল। প্রাথমিকভাবে সবাই কেবল সবার সাথে হাই হ্যালো ছাড়া আর তেমন কিছুই হলো না।
রাতের অন্ধকার চিরে আমরা ১৬ জন স্বপ্নবাজ মানুষ কাশ্মীর জয় করতে বেনাপোলের দিকে ছুটে চলেছিলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর আপুদের তরফ থেকে চকলেট চলে এলো আমাদের কাছে। আসলে সেটা একটা ইস্যু ছিল মাত্র। মূল ব্যপারটা হলো আমরা সবাই সবার কাছে সহজ হচ্ছিলাম। যেন এই ট্যুরে আমাদের কারো ভিতর বিন্দুমাত্র কোনো জড়তা না থাকে। মজাটা যেন কোনো অবস্থাতেই কম না হয়ে যায়।
আমাদের বাস যখন বেনাপোল পৌঁছলো তখন ঘড়িতে প্রায় ৮টা বেজে গেছে। বাস থেকে নেমেই আমাদের সবার পাসপোর্টগুলো রয়েল কোচের পক্ষ থেকে একজন জমা নিয়ে আমাদের বুকের বাম পাশে তাদের পরিবহনের একটি ছোট স্টিকার মেরে দিলো। যাতে আমরা যে রয়েল কোচের যাত্রী এটা চিনতে সুবিধা হয়।

 

কি আর করা, আমরাও এই স্টিকার বুকের উপর নিয়ে ঘুরতে থাকলাম। একটু পর শুরু হলো বর্ডার ক্রস করার পালা। এই ব্যাপারটি ছিল খুবই একটা জাবা জাবা’র (জাবা জাবা হলো আমার সিরাজগঞ্জের আঞ্চলিক একটি শব্দ। অনেক সমস্যা, বিরক্তি এবং ঝামেলা–এই সকল ব্যাপার একসাথে বোঝাতে এই জাবা জাবা শব্দটি ব্যবহার করা হয়।) তবে ইমরান ভাই শক্ত হাতেই সেই সব জাবা জাবা শেষ করলেন। সাথে আমাদেরও সহযোগীতা ছিল। তবে সবকিছু শেষ করে এবং ঘন্টা দুয়েক লাইনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে ভারতে প্রবেশ করলাম তখন প্রায় এগারোটার মত বেজে গেছে। ক্ষুধায় ততক্ষণে পেট চো চো করছে। কিন্তু ভারতে ঢুকেও কাজ বাকি ছিল। রয়েল কোচের আরেকটি বাস আমাদের এবার কলকাতায় নিয়ে যাবে। তাই আমরা তাদের ভারত কাউন্টারে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম। ততক্ষণে আমাদের ভিতরে কেউ কেউ সিম কিনলো, কেউ কেউ ডলার থেকে রুপি করে নিল।
এভাবে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আমরা গিয়ে রয়েলকোচের নির্ধারিত বাসটিতে উঠে পড়লাম কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় যাওয়ার জন্য।
ওঠার সাথে সাথেই অবশ্য বাস ছেড়ে দিল। কিন্তু বাসের গতি ছিল খুবই মন্থর। অর্থাৎ কি কারণে যেন রাস্তায় জ্যাম ছিল। তাই বলে আমরা বাসের ভিতর কিন্তু মনমরা হয়ে বসে ছিলাম না। কিভাবে কিভাবে যেন সবাই জেনে গিয়েছিল, সেদিন অর্থাৎ ৫ সেপ্টেম্বর আমার জন্মদিন ছিল। পুরো ট্যুরের ১৬ জন মেম্বারের মধ্যে সেদিন আমার জন্মদিন !! ভাবা যায় ! ইমরান ভাই লম্বাটে সাইজের একটি বেকারী কেক আগে থেকেই কিনে রেখেছিলেন। আমি জানতামও না। সেটি দিয়েই আমার জন্মদিনের উৎসব শুরু হলো। শুরু হলো তো হলোই, আর থামাথামি নেই। আমাকে নিজ হাতে সবাইকে কেক খাওয়াতে হলো। গান গাইতে হলো। বাসের অন্যসব যাত্রীগণও যে আমাদের সাথে বিষয়টি উপভোগ করছিলেন তার প্রমাণ হলো পিছনের সিটের কয়েকজন যাত্রী (এক দিদি, এক আন্টি এবং তাদের আশে পাশের আরো অনেকেই) রীতিমত আমাদের সাথে যোগ দিয়ে দিলেন। আন্টি তো তার বাড়ি থেকে বানিয়ে আনা তালের পিঠা মুড়ি আমাদের সযত্নে খেতে দিলেন। আহা, ওটা কোনোদিন ভুলবার নয়।

রয়েল কোচ ছুটে যাচ্ছিল। আমাদের মজাও থেমে ছিল না। ইমরান ভাই ব্যাগ থেকে মন্দিরা বের করলেন। আর আমি গলা থেকে গান। সাথে সবাই সুর মেলাচ্ছিল। আহা ! বিদেশ বিভূইয়ে, অচেনা, অপরিচিত মানুষের মাঝে, অচেনা রাস্তায় এই অভিজ্ঞতাও এক জীবনে পরম পাওয়া।
বাস তো চলছিলই, সাথে পাল্লা দিয়ে রাস্তার পাশের গাছের সারি, ঘরবাড়ি, অচেনা গ্রামও যেন পাল্লা দিয়ে পিছনে ছুটে যাচ্ছিল। কিন্তু পিছু ছাড়ছিল না ক্ষুধা বাবাজি। সময় গড়াতে গড়াতে সেও চাগার দিয়ে উঠছিল। ভারতে ঢুকে খাওয়া বলতে তো শুধু ওই এক স্লাইস করে কেক আর পানি। কিন্তু সেই পানিও তল পেটে জমে জমে এক নম্বর সংকেত দিয়ে যাচ্ছিল ক্রমাগত। সেই সংকেতে প্রথমেই কাইত হয়ে পড়লেন আমার পাশের সিটে বসা সায়েম ভাই। মুখ ফুটে সায়েম ভাই যখন সেই কথা বললেন তখন আমার সব মনোযোগ সেদিকেই আটকে গেল। যেভাবেই হোক সায়েম ভাইকে এই বিপদ সংকেত থেকে উদ্ধার করতে হবে। সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। তারপর ব্যালান্স রেখে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম ড্রাইভার পর্যন্ত। অনেকটা দাদাদের স্টাইলে বিষয়টা ড্রাইভারকে জানালাম। ওঁরা বললো, সামনেই একটা ধাবা আছে। ওখানে গাড়ি থামানো হলে খাওয়া দাওয়া এবং এক নম্বর দুই নম্বর সব খালাস হবে।
শুনে পুলকিত হলাম। আহা, ক্ষুধা আমার যেন আর বাঁধ মানছিল না। জানিনা সায়েম ভাইয়ের তরল জাতীয় পদার্থ বাঁধ মানছিল কিনা।

অবশেষে গাড়ি ধাবায় থামলো। হুড় মুড় করে নেমে পড়লাম সবাই। কেউ হেলে দুলে ছুটে গেল খাবার টেবিলের কাছে। কেউ আবার উসাইন বোল্টের মতো ছুটে গেল টয়লেটের দিকে। কিছুক্ষণ পর সায়েম ভাইয়ের মুখে তৃপ্তির হাসি। আহা, জগতের সব শান্তি যেন ওই মুখেই ছড়িয়ে ছিল। ওম শান্তি।
আমরা ১৬ ক্ষুধার্ত প্রাণ গিয়ে বসলাম খাবার টেবিলে। অর্ডার করতেই ভালোবাসাময় খাবার চলে এলো। জীবনের প্রথম ভিন্ন দেশে ভিন্ন পরিবেশের ভিন্ন খাবার। এই তিন ভিন্ন মিলে যে পরিবেশ তৈরী হলো তা নেহায়েত ভিন্ন কিছু ছিল না। ছিল মুরগির মাংস আর সবজি। সাথে দুই পিস ভালোবাসা। তবে ক্ষুধার রাজ্যে ভালোবাসার মূল্য যে কত নগণ্য তার প্রমাণ সেদিন পেয়েছিলাম। তাই আমি প্লেট থেকে ভালোবাসা সরিয়ে সাইডে রেখে খাবারটাই আগে গ্রহণ করলাম। বলতে দ্বিধা নেই, স্বাদ যাই হোক ক্ষুধার কারণে পেট পুরেই খেলাম।

22135488_10207640384126704_6515781631092563275_o
ধাবার ভালোবাসাময় খাবার

খাওয়া শেষে হালকা ডেজার্টও হলো। মানে ধাবার পাশের এক দোকান থেকে ঘোল জাতীয় এক তরল পদার্থ কিনে খেলাম। সেটা দারুণ ছিল। প্রায় ৪৫ মিনিট পরে আমরা আবার কলকাতার দিকে রওনা হলাম ধাবা ছেড়ে। এই ধাবা আমাদের পরবর্তী দিনগুলোর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল।
যা বলছিলাম, বাস ছুটে যাচ্ছিল “ছালকুত্তা”র দিকে। জায়গাটা কেউ চিনবেন, আবার কেউ চিনবেন না। আমাদের ১৬ জনের সবাই এই “ছালকুত্তা” জায়গাটা বেশ চিনতে পারবো। আমরা তো যাচ্ছিলাম আসলে কলকাতাতেই। ইমরান ভাই প্যাঁচটা লাগালেন। কে যেন ইংরেজিতে Calcutta (ক্যালকাটা) উচ্চারণ করেছিল “ছালকুত্তা” বলে! এবার বুঝুন ঠ্যালা। দাদারা শুনলে কি হতো?
কি হতো আর না হতো তা বলতে পারবো না, তবে আমার ভিতর প্রচন্ড এক শিহরণ হলো কলকাতার দেয়ালে দেয়ালে সানি লিওনের বাংলা সিনেমার পোস্টার দেখে। সিনেমার নাম “শ্রেষ্ঠ বাঙাগলী।” মারাত্মক পজিশনের সিন সেই পোস্টারে। ইমরান ভাইকে বললাম, ভাই কলকাতায় তো এক রাত আছি। চলেন শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী দেখি। ইমরান ভাই বিভ্রান্ত হলেন। রাজনৈতিক ছবি কিনা এটা ভেবে। কিন্তু যখন পোস্টার দেখলেন, তখন তার চেহারার দারুণ এক কূটনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছিল। সেটা দেখার মত।
অবশেষে আমরা ছালকুত্তা মানে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় পৌঁছে গেলাম সন্ধ্যা নাগাদ। কে যেন বাসের ভিতর বলেছিল, হরিদাসপুর থেকে নিউমার্কেটের দূরত্ব মাত্র ৮০ কিলোমিটার। তার জন্য এখন আমার করুণা। যদি তাই হয়, তো ধরে নিন এই ৮০ কিলোমিটার রাস্তা পার হতে আমাদের দুপুর বারোটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা বাজলো।


আমাদের জন্য আগে থেকেই হোটেল বুকিং করা ছিল। হোটেলের নাম প্যারাডাইস গেস্ট হাউস। প্যারাডাইস পাওয়ার কথা ছিল কাশ্মিরে গিয়ে। কিন্তু কলকাতাতেই পেয়ে যাওয়াতে মনে মনে আন্দোলিত হলাম। রুম বুঝে নিয়ে যে যার মত ঢুকে পড়লাম। কাপড় চোপর ছেড়ে একটু ফ্রেস হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম দলবলসহ। উদ্দেশ্য নিউমার্কেট ঘুরবো এবং কিছু স্ট্রিট ফুড খাবো।
হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম সবাই নিউ মার্কেট এলাকাতে। নাঈম ভাই একটা ইনস্ট্যান্ট বানানো মিক্সড ফ্রুট জুস খাওয়ালেন সবাইকে। যদিও নাঈম ভাইর দেখানো পথে আমরা খেয়েছি, কিন্তু কানে কানে বলে রাখি, ওটার বিল কিন্তু পেমেন্ট করেছিলাম আমি। ওই শুরুতেই বলেছিলাম ওই দিন আমার জন্মদিন ছিল। তো ট্রিট তো দেয়া হয়নি। তাই ওই জুসই ছিল ট্রিট।

22096260_10207640384166705_2553074646787610493_o
কোলকাতার জুসের দোকান

জুস শেষ করে আপুরা সুর তুললেন পানি পুরি খাবেন। সেটাও খাওয়া হলো। স্বাদ অনেকটাই আমাদের ফুচকার মত। ওটা শেষ করে খেলাম চাওমিন। আহারে চাওমিন। বাকি পনের দিন ওই চাওমিন যে আমাকে কতটা আপন করে নিয়েছিল সেটা নিউমার্কেটে প্রথম বারের মত চাওমিন খেতে খেতে ঘূণাক্ষরেও অনুমান করতে পারিনি।

 

খাওয়ার পর্ব শেষ করে সবাই গেলাম মেট্ররেলে চড়তে। সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলাম পাতালে। আমার জীবনের প্রথম পাতাল রেলে ভ্রমণ। অভিজ্ঞতা দারুণ ছিল। সিস্টেমও খুব পছন্দের ছিল। তবে সিস্টেম ব্রেক করার খেসারত হিসেবে ইমরান ভাইয়ের মোবাইলটা নিয়ে নিয়েছিল কর্তব্যরত এক মহিলা পুলিশ। ঘটনা হলো, ইমরান ভাই মেট্রোরেলের কিছু ছবি তুলছিলেন, সাথে সাথে কোত্থেকে এক মহিলা পুলিশ চিলের মতো ছো মেরে উনার মোবাইলটা নিয়ে নিলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় ইমরান ভাই আর আমি দুজনেই স্তব্ধ। আমাদের বাকি মেম্বাররা বিষয়টা অবশ্য টের পাননি। পরে অনেক অনুনয় বিনয় করে ক্ষমা চেয়ে মহিলার কাছ থেকে মোবাইল নিতে হয়েছে। আমি অবশ্য চামে কিছু ছবি তুলে ফেলেছিলাম।

 

 
তবে সেই গ্লানি দূরীভূত হয়েছিল যখন আমরা মেট্রোরেলে চড়েছিলাম। দারুণ অভিজ্ঞতা। পাঁচ রুপিতে টিকিট করে নিউমার্কেট এলাকা থেকে মাত্র মিনিট পাঁচের একটি ভ্রমণ শেষ করে আমরা গিয়ে নেমেছিলাম রবীন্দ্র সরোবর নামক এক জায়গায়। ওখান থেকে আবার লোকাল বাসে করে ফিরে এসেছিলাম নিউ মার্কেট। তারপর আমাদের হোটেলে। তার আগে রাতের খাবার খেয়েছিলাম সবাই দাওয়াত নামক এক রেস্টুরেন্টে। আমিসহ দু তিনজন অবশ্য আর রাতে কিছু খাইনি। কিন্তু বাকিরা বলেছিল খাবারের স্বাদ ১০/১০ ।
কলকাতা ট্যুর বলতে আমাদের সেটুকুই ছিল। কিন্তু দারুণ ছিল। হোটেলে ফিরে যে যার মত শুয়ে পড়ি। কারণ পরদিন সকাল সাড়ে চারটায় উঠতে হবে। কারণ আমাদের দিল্লি যাবার ফ্লাইট ছিল সকাল সাড়ে ছয়টায়।
শুয়ে ঘুম আসছিল না কিছুতেই। মুহুর্তের জন্য কেমন আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম মাতৃভূমির জন্য। এই অচেনা পরিবেশে, অচেনা জায়গায় শুয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু বুকের এক পাশে মৃদু সুরে বেজে যাচ্ছিল —-
“তুমি মিশেছ মোর দেহের সনে
তুমি মিলেছ মোর প্রাণে-মনে
তুমি যে সকল সহা, সকল বহা মাতার মাতা
ও আমার দেশের মাটি, তোমার প’রে ঠেকাই মাথা।”

(ধারাবাহিক চলবে)